বাবা মার ভালো চাওয়া এবং সন্তান!

আমরা মোটামুটি সবাইই একটা দুই বা তিন রুমের বাসায় একরুমে নিজে থাকি। আর অন্যরুমে “বাবা-মা” নিয়ে থাকি। সেই ছোট থেকে শুনে আসছি এরাই আমার সব! এদের চে বেশি ভাল আমাকে কেউ বাসে না! আমি ভাবলাম এই কথাটা পরীক্ষা করে দেখি একবার!

আমাকে প্রায়ই আব্বু আম্মু বলে আমি সারারাত কেন মোবাইল নিয়ে পরে থাকি। আমি কেন ঘুমাই না? আমি বুঝলাম তারা সত্যিই আমার ভাল চায়। তারা চায় আমি যেন রাতে কোন টেনশন ছাড়া আরামে ঘুমাই। কিন্তু তারা যেটা চায় না সেটা হচ্ছে, আমি কেন ঘুমাচ্ছি না সেটা জানতে চাওয়া। কিন্তু আমার ভাল যেহেতু চায়। তাই এই দোষ মাফ। কিন্তু তবুও এইখান থেকে আমার একটা-দুইটা-তিনটা মন খারাপের গল্প জন্ম নেয়।

আরেকদিন দেখলাম, আমি দিনের পর দিন আমার ঘরটা থেকে বের হচ্ছি না দেখে আব্বু বেশ বিরক্ত। আমি বুঝলাম, তারা চায় আমি এইভাবে ঘরকুনো না হয়ে বাইরে যাই। অবশ্যই আমার ভালর জন্য‌! শুধু জানতে চায় না এই ঘরটার বাইরে আমার কিসের এত ভয়?! কেনই বা এই একটা রুম আমাকে ছাড়ছেই না! তারপর সেখান থেকে দশটা-বিশটা তিরিশটা মন খারাপের গল্প জন্ম নেয়৷

আমার মাঝেমধ্যেই প্রচন্ড কান্না পায়। অকারণে কান্না পায়। একদিন আমি সহ্য করতে না পেরে আম্মুকে ধরে ভয়ানক কান্না জুড়ে দিলাম। কিচ্ছুক্ষণ আমাকে কি হয়েছে না হয়েছে এইসব জিজ্ঞেস করে এরপর সমানে বকাবকি শুরু হলো অযথা এইসব নাটক করছি তাই। আমি বুঝলাম তারা আমার ভাল চায়! তারা চায় আমি যাতে কান্নাকাটি করে মাথাব্যথা না বানাই। তারা শুধু যেটা চায় না সেটা হলো আমি আমার ইমোশনগুলো তাদের মধ্যেও পাস করি। আমার একদিন মন খারাপ হলে আমার মা যে আমার সাথে কিছুক্ষণ গান ফুলিয়ে বসে থাকলেই সব ঠিক হবে এটা তারা চায় না। আবার এখান থেকে আশিটা-নব্বইটা-একশোটা মন খারাপের গল্প জন্ম নেয়।
আমি সবসয় টের পাই আমাদের বাবা মায়েরা আমাদের ভাল চায়। শুধু সেই ভালটা হতে হবে তাদের নিয়মে। তাদের নিয়মে যদি মেন্টালি বা ফিজিকালি এ্যাবিউজ করা থেকে থাকে সেটাই ভাল। তাদের নিয়মে যদি আপনার নিজের বন্ধুদের বিসর্জন দিতে হয় সেটাই ভাল। এই নিয়মে যদি আপনি হাঁটতে গিয়ে পরে মরেও যান, তাহলে আপনি আরো ভাল। অনেকটা ধর্মের যুদ্ধে শহীদ হওয়ার তকমা পাবেন।

আর কতদিন বলেন তো? আর কতদিন এই “প্যারেন্টিং” ব্যাপারটাকে মহিমান্বিত করে যাবেন? সব প্যারেন্টস বেস্ট হয় না! সব বাবা মা আপনার বা আমার বন্ধু হয় না। সবার কাছে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং, ক্যুল আর ফ্রেন্ডলি বাপ মা থাকে না। ইট ইজ হাই টাইম টু নো দ্যাট, আমাদের বাপ-মা ভুল ডিসিশন নেয়, তারা তাদের কিছু করতে না পারার বোঝাটা আমাদের মাথায় দেয়! আমাদের প্যারেন্টস বলেই যে তারা সবকিছুতে সঠিক হবে এটা হয় না! আর আপনার কাছে যদি এইরকম বেহেস্তী লেভেলের প্যারেন্টস থেকে থাকে সেইটা আপনার পার্সোনাল হেভেন! সবাইকে ঐ একই দাঁড়িপাল্লায় মাপবেন না।

একটা আস্তা জেনারেশন ধরে নিজের বাপ মায়ের কাছ থেকে সবকিছু লুকিয়ে বড় হতে হচ্ছে আমাদের। কেন জানেন? কারণ শুধুমাত্র আমাদের বাবা মা আমাদের ভাল চায়। আমরা আড্ডা দিতে যাই লুকিয়ে, গল্পের বই পড়ি লুকিয়ে, এমনকি গল্প লিখিও লুকিয়ে! আমরা ছেলে বন্ধুদের বাসায় আনতে পারি না কারণ বাবা মা আমাদের ভাল চায়। আমরা রাস্তায় হাঁত ধরে প্রেমিকের সাথে হাঁটতে পারি না কারণ বাবা মা আমাদের ভাল চায়। আমরা একটা গ্রুপের সবাই মিলে ট্যুরে যেতে পারি না, কারন আমাদের বাবা মা আমাদের ভাল চায়! আর কত ভাল চাইলে আমি অন্তত একদিন আম্মু-আব্বুকে ডেকে বলতে পারবো যে আমি একটাবার এই ভাল চাওয়ার দেয়ালটা ভেঙে আমার পৃথিবীটাতে তাদের ঘুরাতে চাই?

নওশীন শহীদ